১৯ এপ্রিল ২০২৬ , ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

ডক্টর আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল: ব্যক্তি ও কবি

আপলোড সময় : ১৯-০৪-২০২৬
ডক্টর আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল: ব্যক্তি ও কবি
//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন// “চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা—মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা।” এই অমর পংক্তি উচ্চারিত হলেই মানসপটে ভেসে ওঠে এক সাধক-কবির নাম—ডক্টর আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। তিনি কেবল একজন কবিই নন; ছিলেন দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং মুসলিম জাগরণের এক মহান অগ্রদূত। ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন ইকবাল। বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছে। ইসলামী দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা তাঁর চিন্তারই প্রতিফলন, যা পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। “আল্লামা” শব্দের অর্থ শিক্ষাবিদ—এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত। তাঁর ফার্সি রচনার জন্য ইরানেও তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত; সেখানে তিনি “ইকবাল-ই-লাহোরী” নামে পরিচিত। ইকবালের পিতামহ শেখ রফিক কাশ্মির থেকে শিয়ালকোটে এসে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতা শেখ নুর মোহাম্মদ ছিলেন পেশায় দর্জি, কিন্তু চিন্তাধারা ও জীবনাচরণে ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সুফি মননের মানুষ। তাঁর মা ইমাম বিবিও ছিলেন ধার্মিক ও স্নেহশীলা। পারিবারিক এই পরিবেশেই ইকবালের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা ও নৈতিকতার বীজ রোপিত হয়। শিক্ষাজীবনের সূচনা শিয়ালকোটে। স্কটিশ মিশন কলেজে তিনি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর কাব্যপ্রতিভার প্রথম স্বীকৃতি দেন তাঁর শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসান। ১৮৯২ সালে তিনি সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। পরবর্তীতে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হয়ে দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাস্টার্স অধ্যয়নের সময় তিনি স্যার টমাস আর্নল্ডের সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেন এবং তাঁকে ইউরোপে উচ্চশিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯০৫ সালে ইকবাল ইউরোপে যান; কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডনের লিঙ্কনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। পরে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ইউরোপে অবস্থানকালেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দেশে ফিরে লাহোরে শিক্ষকতা, আইন পেশা এবং সাহিত্যচর্চা একসঙ্গে চালিয়ে যান। তবে তাঁর প্রকৃত অনুরাগ ছিল সাহিত্য ও দর্শনে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে আসরার-ই-খুদি, রুমুজ-ই-বেখুদি, শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া, দ্য রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম, বাল-ই-জিবরাইল, জাভেদ নামা প্রভৃতি। তাঁর “খুদি” দর্শন ব্যক্তি-সত্তার জাগরণ, আত্মমর্যাদা ও সৃজনশীল শক্তির এক গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করে। ইকবালের চিন্তা ও দর্শন উপমহাদেশের বহু নেতা ও চিন্তাবিদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর চিন্তায় অনুপ্রাণিত হন। সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী তাঁর ভাবধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামী পুনর্জাগরণের আন্দোলন গড়ে তোলেন। ইরানের ড. আলী শরিয়তীও তাঁর দর্শনে প্রভাবিত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যেও তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ তাঁর দর্শনে অনুপ্রাণিত হন। বাংলাদেশে তাঁর সাহিত্যচর্চা ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। “আল্লামা ইকবাল সংসদ” ও “রেনেসাঁস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ”সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাঁর সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর বহু রচনা ইতোমধ্যে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল এই মহান কবি ও দার্শনিক ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সাহিত্য আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের চিন্তাকে আলোড়িত করে চলেছে। আল্লামা ইকবালের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি: ইলম আল ইকতিসাদ (১৯০১) Islam as an Ethical and Political Ideal (১৯০৮) The Development of Metaphysics in Persia (১৯০৮) আসরার-ই-খুদি (১৯১৫) রুমুজ-ই-বেখুদি (১৯১৭) পয়গাম-ই-মাশরিক (১৯২৩) বাং-ই-দারা (১৯২৪) জাবুর-ই-আজম (১৯২৭) The Reconstruction of Religious Thought in Islam (১৯৩০) জাভেদ নামা (১৯৩২) বাল-ই-জিবরাইল (১৯৩৩) পাস চে বায়াদ কারদ আই আকওয়াম-ই-শার্ক (১৯৩৬) মুসাফির (১৯৩৬) জারব-ই-কালিম (১৯৩৬) আরমাঘান-ই-হিজাজ (১৯৩৮) ## লেখক: ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ